অবরুদ্ধ নিশীথ আসলে কোনো উপন্যাস না। এটা একটা দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন। এমন এক দুঃস্বপ্ন, যেটা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মনে হয়— “এই গল্পটা তো আমি কোথাও দেখেছি।” হয়তো খবরের কাগজে, হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো করিডোরে, হয়তো কোনো মেয়ের নীরব চোখে।
তেজস্মিতা মুর্তজার এই উপন্যাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো— তিনি পাঠককে কখনো প্রস্তুত হওয়ার সময় দেন না। খুব সাধারণ, খুব নিরীহ একটা দৃশ্য দিয়ে শুরু করেন, তারপর ধীরে ধীরে পাঠককে এমন এক অন্ধকারে নিয়ে যান, যেখান থেকে বের হয়ে আসার পরও মন অনেকক্ষণ আলো খুঁজে পায় না।
দিনাজপুরের হাবিপ্রবির শহীদ মিনার চত্বর। বিকেলের শেষ আলো। চারপাশে রাজনৈতিক পোস্টার, সিগারেটের ধোঁয়া, আড্ডা, হাসাহাসি। সেই ভিড়ের মাঝখানে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মেয়ে মাহেজাবিণ আরমিণ অন্তু। মেয়েটা খুব সাধারণ। একটু ভীতু, একটু জেদি, আবার অদ্ভুত রকম নরমও। রাস্তা পার হওয়ার সময় আব্বুর হাত শক্ত করে না ধরলে যার ভয় লাগে, সেই মেয়েটাই একদিন একটা সিগারেট পায়ে মাড়িয়ে দেয়।
এত ছোট একটা ঘটনা।
কিন্তু ক্ষমতাবান মানুষের অহংকারে ছোট অপমান বলে কিছু থাকে না।
অন্তু তখনও জানত না, যাকে অপমান করল সে জেলা ছাত্রলীগের জেনারেল সেক্রেটারি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অঘোষিত রাজা। যার ইশারায় হল দখল হয়, মানুষ গুম হয়, মেয়েদের জীবন নষ্ট হয়। আর এখান থেকেই শুরু হয় অন্তুর পতন না— বরং তার জীবনের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র।
এই জায়গাটায় এসে উপন্যাসটা আর কেবল ব্যক্তিগত গল্প থাকে না। এটা হয়ে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক রক্তাক্ত প্রতিচ্ছবি।
তেজস্মিতা রাজনীতিকে পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেননি। তিনি রাজনীতিকে একটা জীবন্ত চরিত্র বানিয়েছেন। ক্ষুধার্ত চরিত্র। যে মানুষ খায়। যে স্বপ্ন খায়। যে ভালোবাসাকেও শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করে ফেলে।
জয় আমির — অন্ধকারের ভেতর আটকে থাকা এক মানুষ
জয় আমির চরিত্রটা সম্ভবত সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জটিল পুরুষ চরিত্রগুলোর একটা। তাকে আপনি নায়ক বলতে পারবেন না। ভিলেন বললেও ভুল হবে। সে এমন এক মানুষ, যাকে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে পাঠক নিজেই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
জয়ের শৈশবটা উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলোর একটা। একটা শিশু নিজের চোখের সামনে মায়ের উপর অত্যাচার দেখছে, বাবার মৃত্যু দেখছে, দাদার কাটা মাথা দেখছে— এসব ঘটনা তাকে ধীরে ধীরে মানুষ থেকে অন্য কিছু বানিয়ে ফেলে। তার ভেতরের কোমলতা মরে যায়, কিন্তু পুরোপুরি না। সেই মৃত কোমলতার গন্ধ পুরো উপন্যাসজুড়ে লেগে থাকে।
এই কারণেই জয় আমিরকে ঘৃণা করেও পুরোপুরি ঘৃণা করা যায় না।
তার মধ্যে এক ধরনের বিষণ্নতা আছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, সে নিজেও জানে সে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু আর ফেরার রাস্তা নেই। তার ঠোঁটের সেই অদ্ভুত হাসি— যেটার কথা এত পাঠক রিভিউতে লিখেছেন— আসলে হয়তো এক অসহায় মানুষের হাসি। যে পৃথিবীকে বিশ্বাস করে না, নিজেকেও না।
একটা দৃশ্য আছে, যেখানে জয় খুব নির্লিপ্তভাবে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করছে। আর ঠিক তার পরের দৃশ্যেই দেখা যায়, গভীর রাতে সে একা বসে আছে। চারপাশে অন্ধকার। তার চোখে ঘুম নেই। এই দ্বৈততাই চরিত্রটাকে ভয়ংকরভাবে বাস্তব করেছে।
অন্তু ও জয়ের সম্পর্ক — ভালোবাসা না মানসিক যুদ্ধ?
অন্তুর সঙ্গে জয়ের সম্পর্কটাও খুব অদ্ভুত। এখানে প্রচলিত প্রেম নেই, রোমান্টিকতা নেই, “হ্যাপি কাপল” হওয়ার কোনো প্রচেষ্টা নেই। বরং আছে দখল, মানসিক যুদ্ধ, অদ্ভুত এক টানাপোড়েন। পাঠক বারবার আশা করে— হয়তো এবার জয় বদলাবে। হয়তো এবার সে অন্তুকে বাঁচাবে। কিন্তু বাস্তবের মতো এখানেও মানুষ সবসময় বদলায় না।
উপন্যাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশগুলোর মধ্যে অন্তুর জোরপূর্বক গর্ভপাতের ঘটনাটা আলাদা করে বলতে হয়। এই অংশ পড়ার সময় সত্যিই মনে হয়— এখন নিশ্চয় কেউ এসে দরজা ভাঙবে। কেউ অন্তুকে বাঁচাবে। কারণ আমরা সিনেমা দেখে অভ্যস্ত। আমরা শেষ মুহূর্তে নায়ক আসবে বলে বিশ্বাস করি।
কিন্তু অবরুদ্ধ নিশীথ সেই মিথ্যা সান্ত্বনা দেয় না।
এখানে কেউ আসে না।
অন্তু একা কাঁদে। একা রক্ত ঝরায়। একা বেঁচে থাকে।
আর এই একাকীত্বটাই উপন্যাসের আসল ভয়।
অন্তুর চরিত্রটা যত এগোয়, তত বদলাতে থাকে। শুরুতে যে মেয়েটা খুব নরম ছিল, ধীরে ধীরে সে পাথর হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো— তার মানবিকতা মরে না। এত অত্যাচার, এত ক্ষতি, এত মৃত্যু দেখার পরও সে পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায় না।
এই জায়গাটায় এসে চরিত্রটা অসাধারণ হয়ে ওঠে।
কারণ বাস্তব জীবনের সবচেয়ে শক্ত মানুষগুলোও ভেতরে ভেতরে খুব ভাঙা থাকে।
হামজা পাটোয়ারী ও তরুনিধি — ক্ষমতা ও একপাক্ষিক ভালোবাসার ট্র্যাজেডি
হামজা পাটোয়ারী চরিত্রটা যেন পুরনো বাংলার সামন্তবাদের প্রতীক। সে ক্ষমতাকে ভালোবাসে। নিয়ন্ত্রণকে ভালোবাসে। মানুষকে নিজের সম্পত্তি ভাবতে ভালোবাসে। জয়কে সে নিজের সন্তানের মতো বড় করেছে, আবার নিজের স্বার্থেই তাকে ধ্বংসের দিকেও ঠেলে দিয়েছে।
হামজার চরিত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো— সে নিজেকে কখনো খলনায়ক ভাবে না। বরং সে বিশ্বাস করে, যা করছে তা প্রয়োজনীয়। এই ধরনের মানুষ বাস্তব জীবনেও সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়।
তরুনিধি উপন্যাসের এক নিঃশব্দ ট্র্যাজেডি। মেয়েটা জয় আমিরকে ভালোবেসেছিল। সেই ভালোবাসার কোনো ভবিষ্যৎ নেই জেনেও। জয়ের পাপ, অন্ধকার, নিষ্ঠুরতা— সব দেখেও সে সরে আসতে পারেনি।
তরুর অংশগুলো পড়লে খুব শান্ত একটা কষ্ট হয়। মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে করুণ মানুষগুলো তারা, যারা ভুল মানুষকে ভালোবেসে ফেলে।
মুরসালীন মহান — অন্ধকারের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন
মুরসালীন মহান চরিত্রটা যেন পুরো উপন্যাসে হঠাৎ এক ঝলক আগুন। তার মধ্যে প্রতিশোধ আছে, ক্রোধ আছে, আবার ন্যায়বোধও আছে। যখন সে নিজের বোনের উপর হওয়া অন্যায়ের জবাব দেয়, তখন পাঠকের মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি কাজ করে। কারণ এত অন্ধকারের মাঝে পাঠকও তখন প্রতিশোধ চাইতে শুরু করে।
এটাই উপন্যাসের সাফল্য।
এটা আপনাকে নিরপেক্ষ থাকতে দেয় না।
আপনি চরিত্রগুলোর সঙ্গে ঘৃণা করবেন, কাঁদবেন, প্রতিশোধ চাইবেন, আবার কিছু জায়গায় নিজেকেই প্রশ্ন করবেন— “আমি হলে কী করতাম?”
তেজস্মিতার ভাষা — অশ্লীলতাহীন অথচ নির্মম
তেজস্মিতার ভাষা নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়। তার লেখায় অশ্লীলতা নেই, কিন্তু তীব্রতা আছে। তিনি সহিংসতা লেখেন, কিন্তু শব্দ দিয়ে শরীর প্রদর্শন করেন না। বরং মানুষের মানসিক ভাঙনকে এমনভাবে লেখেন যে বুক ভার হয়ে আসে।
হুমায়ূন আহমেদের মতো তারও একটা ক্ষমতা আছে— খুব সাধারণ বর্ণনা দিয়ে হঠাৎ গভীর বিষণ্নতা তৈরি করা। একটা চায়ের কাপ, একটা ভেজা বারান্দা, গভীর রাতে কারো নিঃশব্দ বসে থাকা— এসব ছোট ছোট দৃশ্য দিয়ে তিনি চরিত্রের ভেতরের ঝড় বুঝিয়ে দেন।
উপন্যাসের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারও দারুণ। কোথাও জোর করে বসানো লাগে না। বরং মনে হয়, চরিত্রগুলো সত্যিই দিনাজপুরের মানুষ। তাদের রাগ, ভয়, প্রেম— সবকিছু বাস্তব।
কেন পড়বেন অবরুদ্ধ নিশীথ ?
বইটার সবচেয়ে বড় গুণ সম্ভবত এটিই— এটা “গল্প” মনে হয় না।
মনে হয়, কোথাও সত্যিই জয় আমির নামে একজন ছিল। সত্যিই কোনো অন্তু রাতের পর রাত কেঁদেছে। সত্যিই কোনো তরুনিধি ভুল মানুষকে ভালোবেসে ধ্বংস হয়েছে।
আর শেষ পর্যন্ত এসে বুঝবেন, অবরুদ্ধ নিশীথ নামটা শুধু একটা রাতের কথা না। এটা এমন সব মানুষের জীবন, যাদের চারপাশে অন্ধকার এত ঘন হয়ে গেছে যে সকাল এলেও আলো পৌঁছায় না।
এই উপন্যাস পড়া সহজ না। অনেক জায়গায় থেমে যেতে ইচ্ছে করবে। অনেক জায়গায় বুক ধকধক করবে। কিছু কিছু জায়গায় এত রাগ হবে যে বই বন্ধ করে রাখতে মন চাইবে।
তবু পড়বেন।
কারণ কিছু উপন্যাস আনন্দ দেয়, আর কিছু উপন্যাস মানুষকে বদলে দেয়। অবরুদ্ধ নিশীথ সম্ভবত দ্বিতীয় ধরনের। কোনো এক গভীর রাতে হয়ত আপনারও মনে হবে - পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ রাতগুলোর নামই বোধহয় “অবরুদ্ধ নিশীথ” ।
